শতবর্ষের আলোকে গোপালনগর হরিপদ ইনস্টিটিউশন

              গোপালনগর ও পার্শ্ববর্তী এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষা ও সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে শিক্ষার আলো পৌঁছে দিতে স্থানীয় বিদ্যোৎসাহী রায়সাহেব হরিপদ প্রামানিক মহাশয় ১৯২৬ সালের ১৩ ই আগস্ট ‘হরিপদ ইনস্টিটিউশন’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শিক্ষার প্রদীপ প্রজ্জ্বলন করেন । আনুমানিক আশি জন ছাত্র নিয়ে স্থানীয় ইউ. পি. স্কুলে পঠন-পাঠন শুরু হয় । প্রধান শিক্ষক হন আকাইপুর নিবাসী শ্রীযুক্ত উমাপদ মুখোপাধ্যায় এবং সম্পাদক হন প্রতিষ্ঠাতা হরিপদ প্রামানিক মহাশয়ের জ্যেষ্ঠ পুত্র হাজারীলাল প্রামানিক মহাশয় এবং সদস্য হন কনিষ্ঠ পুত্র অনুকূলচন্দ্র প্রামানিক মহাশয় । বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কর্মযজ্ঞের অন্যতম প্রধান ও পরবর্তীতে বিদ্যালয়ের আনুষঙ্গিক উন্নতি ও শ্রীবৃদ্ধির মূল কারিগর হাজারীলাল প্রামানিক মহাশয় আমৃত্যু সম্পাদক পদ অলংকৃত করেন । তাঁর মৃত্যুর পর অনুকূলবাবুর পুত্র অনিল কুমার প্রামানিক মহাশয় পঞ্চাশ বছরের অধিক কাল সম্পাদক পদ অলংকৃত করে রেকর্ড সৃষ্টি করেছেন । অনুকূল বাবুর অপরপুত্র অজিত কুমার প্রামানিক মহাশয় প্রতিষ্ঠাতা সদস্যের প্রতিনিধিত্ব করেছেন । প্রতিষ্ঠাতা হরিপদ প্রামানিক মহাশয়ের অর্থায়নে বর্তমান বিদ্যালয় গৃহের স্থানে পাঁচটি পাকা ঘর এবং একটি টিনের চালার ঘর নির্মাণ করে নিজস্ব বাড়িতে পঠন-পাঠন চালু হয় । ১৯২৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় পঞ্চম ও ষষ্ঠ শ্রেণীর পঠন-পাঠনের অনুমোদন প্রদান করে । যদিও প্রতিষ্ঠার সময় থেকে পঞ্চম থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা চালু হয় । ১৯৩৫ সালে বিদ্যালয়কে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের যশোহর জেলার স্কুল বোর্ডের অধীনে ম্যাট্রিকুলেশন স্কুল ( দশম শ্রেণী ) -এর অনুমোদন প্রদান করে । ইতিমধ্যে বিদ্যালয়ের পঠন-পাঠন ও সার্বিক উন্নয়নের সুনাম জেলা অতিক্রম করে পাবনা, বরিশাল, নদীয়াসহ বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়ে । বিভিন্ন জেলার ছাত্ররা ভর্তি হতে শুরু করলে বিদ্যালয়ে ছাত্রাবাসের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয় । হরিপদবাবুর পরিবারের পক্ষ থেকে বিদ্যালয়ে তিনটি হিন্দু হোস্টেল ও একটি মুসলিম হোস্টেল এবং প্রধানশিক্ষকের গৃহ তৈরি করা হয় । বিদ্যালয়ের জন্য প্রয়োজনীয় জমি , মজুত তহবিলের জন্য দশ হাজার টাকার ক্যাশ সার্টিফিকেট , যাবতীয় আসবাবপত্র , সাজ-সরঞ্জাম , পাঠাগারের জন্য পুস্তক এবং হোস্টেলের খরচের একটা বড় আর্থিক অংশ সমস্তটাই প্রতিষ্ঠাতার পরিবারের পক্ষ থেকে বহন করা হয় । কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের থেকে কোন রকম আর্থিক অনুদান গ্রহণ করা হয়নি । পরবর্তীকালে স্কুলের প্রাঙ্গনের জন্য নারায়ণ চন্দ্র দাঁ ,পুষ্করিণীর জন্য হরিবোল চন্দ্র দাঁ এবং খেলার মাঠের জন্য আব্দুল বারি মহোদয়গণের কিছু কিছু জমি দান কৃতজ্ঞ চিত্তে গ্রহণ করা হয় ।
             ১৯৪৭-৪৮ সালে বিদ্যালয়ের প্রথম গ্রান্ট-ইন-এইড লাভ করে । গ্রান্ট-ইন-এইড লাভের পূর্ব পর্যন্ত বিদ্যালয়ের শিক্ষক মহাশয়দের বেতন ও আনুষঙ্গিক খরচ প্রতিষ্ঠাতার পরিবারের পক্ষ থেকে বহন করা হয় । ১৯৬১ সালে মধ্যশিক্ষা পর্ষদ বিদ্যালয়কে এইচ. এস ( উচ্চতর মাধ্যমিক ) বিদ্যালয়ের স্বীকৃতি প্রদান করে এবং বিদ্যালয়ে কলা, বিজ্ঞান ও বাণিজ্যিক শাখা সমন্বিত পঠন-পাঠন চালু হয় । ছাত্রদের মধ্যে সাহিত্যচর্চার আগ্রহ বৃদ্ধি পাওয়ায় বিদ্যালয়ে প্রকাশিত হয় ‘সারণী’ পত্রিকা । ১৯৭৬ সালে উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সংসদ বিদ্যালয়কে এইচ. এস. ( +২ ) বিদ্যালয় রূপে স্বীকৃতি প্রদান করে এবং কলা, বিজ্ঞান ও বাণিজ্যিক শাখা সমন্বিত পঠন পাঠন চালু হয় । পরবর্তীতে ২০০৬ সালে ছাত্রদের মধ্যে পেশাগত অভিমুখী করণের উদ্দেশ্যে ওয়েস্ট বেঙ্গল টেকনিক্যাল এডুকেশন অফ হায়ার সেকেন্ডারী কাউন্সিলের অনুমোদনে ভোকেশনাল স্টিমের পঠন পাঠন চালু হয় ।
          বনগাঁ মহকুমার দ্বিতীয় সুপ্রাচীন ও বৃহত্তম বিদ্যালয় গোপালনগর হরিপদ ইনস্টিটিউশন ঐতিহ্যময় শতবর্ষের দ্বারপ্রান্তে উপস্থিত হয়েছে । দীর্ঘ নিরানব্বই বছরের অতীতকে অতিক্রম করে আজও তার মহান ব্রতকে নিষ্ঠা সহকারে সগৌরবে পালন করে চলেছে । মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে বিস্তীর্ণ সবুজ প্রান্তরে অবস্থিত এই বিদ্যালয় মহান প্রতিষ্ঠাতা স্বর্গীয় হরিপদ প্রামাণিক মহাশয়ের স্বপ্নকে শুধু বাস্তবায়িত করেনি এতদঞ্চলের অগণিত মানুষের শিক্ষা লাভের সুযোগ করে দিয়ে তাঁদের কৃতজ্ঞতা পাশে আবদ্ধ করেছে । বিদ্যালয় সংলগ্ন সুপ্রশস্ত ক্রীড়াঙ্গন দুটি শুধুমাত্র ছাত্রদের কাছে নয়, এলাকার ক্রীড়ামোদী জনসাধারণের কাছেও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে । এখানে শিক্ষা লাভের পর পরবর্তী ছাত্র জীবনে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে কৃতিত্ব অর্জন করে বহুছাত্র জীবনে প্রখ্যাত ও সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছেন । এই বিদ্যালয়ে যাঁরা শিক্ষকতা করতে এসেছেন তাঁদের মধ্যে ‘পথের পাঁচালী’র অমর স্রষ্টা, কথা সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় অন্যতম । গোপালনগর সংলগ্ন বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষের সঙ্গে বিদ্যালয়ের প্রাণের সম্পর্ক। তাঁদের আন্তরিক প্রচেষ্টা ও সহযোগিতায় বিদ্যালয়ের এই অগ্রগতির ধারা অব্যাহত থাকবে ।
               তথ্য সূত্র :
                     ১) অনিল কুমার প্রামানিক , প্রাক্তন সম্পাদক ।
                     ২) বিদ্যালয়ের নথিপত্র ।